Deprecated: __autoload() is deprecated, use spl_autoload_register() instead in /customers/8/3/c/europerkatha.com/httpd.www/wp-includes/compat.php on line 502 জনসমর্থনহীন নাম সর্বস্ব দলের নতুন সাইনবোর্ড – Europerkatha.com

জনসমর্থনহীন নাম সর্বস্ব দলের নতুন সাইনবোর্ড

Posted on by

নির্বাচনকে সামনে রেখে আবারো নতুন জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে বাংলাদেশে। এতে ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের বাইরে অর্থাৎ সরকারবিরোধী উল্লেখযোগ্য সকল দলই রয়েছে। সরকারবিরোধী উল্লেখযোগ্য দল বলছি, তবে ভোটের বিচারে ইতিহাস অনুযায়ী যেগুলো একেবারেই নগন্য।
ভোটের আগে যেসব জোট গঠিত হয় সেগুলো মূলত ক্ষমতায় যাওয়ার উদ্দেশ্যেই তৈরি। এদের মধ্যে থাকে না কোন আদর্শিক মিল, দলের মূলনীতি বা নির্বাচনী ইশতেহারেও ভিন্নতা থাকে। রাজনীতির অন্যতম গুরু প্লেটোর আদর্শিক রাষ্ট্রের কোন অস্তিত্ব এখানে নেই, থাকে শুধু ম্যাকিয়েভিলীর ক্ষমতার যাওয়ার দর্শন। এই দর্শনের উপর ভর করে একই মঞ্চে হাজির হয়েছে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া, একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট এবং বিএনপি। সাথে ছিলেন বারবার তৃতীয় শক্তিকে ক্ষমতায় আনার চেষ্টায় থাকা অন্যতম কুশীলব ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠনের জন্য সংলাপে বসতে তারা সরকারকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়। যদিও এতে সাড়া দেয়নি সরকারী দল আওয়ামীলীগ।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেক বড় বড় রথী মহারথী হারিয়ে গেছেন কালের আবর্তে। রাজনীতি যেহেতু জনগণকে সাথে নিয়ে করতে হয়, জনগণের সমর্থনের মাধ্যমে চালাতে হয়, তাই জনবিচ্ছিন্ন রাজনীতিবিদ যত বড়ই জ্ঞানী বা অভিজ্ঞ হন না কেন একটা সময় তাকে রাজনীতির মঞ্চ থেকে সরে যেতে হয়। আবার অনেক অনভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ শুধুমাত্র সময়ের সাথে সাথে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে হয়ে উঠেন মহিয়ান। ড. কামাল হোসেন বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত ¯েœহভাজন ছিলেন। বাংলাদেশের সংবিধান রচনায় রয়েছে তাঁর অনন্য ভূমিকা। তবে জনগণের কাছাকাছি ছিলেননা কখনো। বঙ্গবন্ধুর ছেড়ে দেওয়া আসনে জয়ী হয়ে তিনি একবার মাত্র সংসদে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের পর তাঁর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ থাকার পরও আওয়ামীলীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা তাঁর উপর আস্থা রেখেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত স্বার্থের দ্বন্ধে ড. কামাল আওয়ামীলীগ ছাড়েন, ঝরে পড়া কিছু রাজনীতিবিদ নিয়ে গড়ে তোলেন গণফোরাম। প্রবীণ সাংবাদিক স্বদেশ রায় গণফোরামকে তুলনা করেছে একটি কনস্পিরেসি হিসেবে। দলটি এখনো কোন নির্বাচনে অংশ নেয়নি, তাই ভোটের হিসাব বলা যাচ্ছেনা, তবে এ দলে থাকা কেউ আমার জীবদ্দশায় সংসদে যায়নি। আরো আশ্চর্যের বিষয় হলো মুখে গণতন্ত্রের ফেনা তোলা ড. কামাল হোসেন প্রতিষ্টালগ্ন থেকে এ দলের সভাপতি এবং একযুগেরও বেশি সময় পার হলেও হয়নি কোন সম্মেলন। বিএনপি থেকে ধাওয়া খেয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরী গঠন করেন বিকল্পধারা, সঙ্গী সেসময়ের উদীয়মান তরুণ বিএনপি নেতা তাঁর ছেলে মাহি বি চৌধুরী। এখনো বাপবেটাই টেনে নিয়ে যাচ্ছেন দলটি। জোটের অন্যতম নেতা সুলতান মনসুর ঢাল নাই তলোয়ার নাই নিধিরাম সর্দারের মতো নিংসঙ্গ শেরপা। মাহমুদুর রহমান মান্না, আসম আবদুর রর এবং জাফরউল্লাহ ভোটের রাজনীতিতে অনেকটা মূল্যহীন। এছাড়া অন্যান্য ছোট দলগুলো শুধুমাত্র নামেই আছে, নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন তালিকায় না থাকায় অন্য দলের প্রতীকে নির্বাচনের জন্য ধর্না দিতে হবে তাদের।
বাংলাদেশে বিগত কয়েকটি নির্বাচনের চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এই জোটে থাকা দলগুলোর ভোট সরকার গঠনে তেমন কোন প্রভাব ফেলবে না। ২০০৮ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র এবং ছোটখাট দলগুলো পেয়েছিল মাত্র ৪.৯ শতাংশ ভোট। যেখানে বিএনপি ভোট পেয়েছিল ৩৩.২ শতাংশ এবং জামায়াত পেয়েছিল ৪.৬ শতাংশ। পক্ষান্তরে আওয়ামীলীগের সমর্থন ছিল ৪৯ শতাংশ এবং এরশাদেও জাতীয় পার্টি পেয়েছিল ৭ শতাংশ ভোট। এর আগে ২০০১ সালের নির্বাচনে ছোট দল এবং স্বতন্ত্র মিলে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ৯ শতাংশের বেশি ছিলনা। বিএনপি ও জামায়াতের প্রাপ্ত ভোট ছিল ৪৫.৬৮ শতাংশ এবং আওয়ামীলীগ ও জাতীয় পার্টির মিলিত ভোট ছিল ৪৭.২৪ শতাংশ। অতএব বলা চলে মূলত বিএনপি এবং জামায়াতের ভোটের উপরই নির্ভর করছে আওয়ামীলীগ সরকারের পরাজয়ের বিষয়টি।
নতুন ঐক্য প্রক্রিয়ার প্রচেষ্টায় থাকা দলগুলোর সাংগঠনিক দক্ষতা যেমন শুণ্যের কোঠায় তেমনি নড়বড়ে অবস্থা এই জোটের পিছনে শক্তি যোগানো চারদলীয় জোটেরও। ২০০৬ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতা ছাড়ার পর থেকে বিএনপি এবং জামায়াতের সাংগঠনিক শক্তির যে ভগ্নদশা চলছে তা থেকে উত্তরণের কোন চিহৃ এখনো দেখা যায়নি। ২০০৯ সালের নির্বাচনে ভরাডুবির পর বিএনপি দলকে নতুন করে গড়ে তুলতে পারেনি, শুধুমাত্র নাম সর্বস্ব কতগুলো দল নিয়ে জোটের পরিধি বাড়িয়ে ১৮ দলীয় জোট করেছে। দলের অনেক শীর্ষ নেতা মামলার ভয়ে দলীয় কর্মসূচীতে অনুপস্থিত থাকেন। দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান জেল দন্ড মাথায় নিয়ে লন্ডনে বাস করছেন। একের পর এক ইস্যু পাওয়ার পরও বিএনপি বড় ধরনের সরকার বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলতে পারেনি।

বরং ২০১৩ সালে সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় জ্বালাও পোড়াও করে হতাহতের  ঘটনায় দলটির ইমেজ সংকট তৈরি হয়েছে। ৮৫ দিন অবরোধ, ঢাকা মার্চের ঘোষণা, ২০১৪ সালের নির্বাচনের দিন সহিংসতা করেও সরকার পতন ঘটাতে পারেনি বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট। বর্তমানে দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া দূর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে জেল খাটছেন। এই মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আখ্যা দিয়ে সাজা হলে দেশ অচলের হুমকি দিলেও কার্যত কিছুই করতে পারেনি দলটি। দলের প্রধান কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে আন্দোলনের কর্মসূচী ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ তাদের আন্দোলন। জোটের অন্যতম শরীক দল বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী যুদ্ধাপরাধী ইস্যুতে মারাত্মক ইমেজ সংকটে পড়েছে। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের কয়েকজনের ইতিমধ্যে ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। জেলদন্ড হয়েছে কয়েকজনের। সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় নাশকতা চালানোর অভিযোগে দলের অনেক নেতাকর্মী রয়েছে জেলে। বিদেশে সরকারবিরোধী প্রপাগান্ডা চালাতে গিয়ে দলটির বিরাট অংকের অর্থ খরচ হয়েছে।  দলের একটি অংশ যুদ্ধাপরাধীদের বাদ দিয়ে নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে। এনিয়ে দলের মধ্যে দ্বন্ধ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে সরকারবিরোধী কোন কর্মসূচীতে দলটির প্রকাশ্য উপস্থিতি চোখে পড়েনা। বহির্বিশ্বে আওয়ামীলীগবিরোধী এবং বর্তমানে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে জেলে থাকা নেতাদের বাঁচাতে লবিংয়ে বেশি ব্যস্ত দলটি।
প্রশ্ন হচ্ছে নির্বাচনের পূর্বে এধরনের জোট গঠনের কারণ কি? সহজ উত্তর ক্ষমতায় যাওয়া। কিন্তু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তির কাছে এই জোট কতটুকু পেরে উঠবে সেটা নিয়ে ভাববার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। যেখানে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি সাংগঠনিকভাবে অনেক শক্তিশালী জামায়াতকে সাথে নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে পারেনি সেখানে নামসর্বস্ব দল নিয়ে শুধুমাত্র জোটের পরিধি বাড়িয়ে সরকারের ভিত কতটুকু নাড়াতে পারবে সেটা অবশ্য ভবিষ্যতই বলে দেবে। এছাড়া ইতিমধ্যে নতুন এ জোটের অন্যতম নেতা বদরুদ্দোজা চৌধুরী বিএনপিকে জামায়াত ছাড়ার শর্ত দিয়েছেন। অতীতে অনেকবার বিএনপিকে জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ার নসীহত করেছেন অনেকে। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত গাঢ়ছাড়া এখনো বলবত রয়েছে। যদিও বিএনপির মহাসচিত মির্জা ফখরুল কয়েকবার বলেছেন, জামায়াতের সাথে জোট শুধুমাত্র ভোটের জন্য। তাই বর্তমানের এই জোট যেহেতু গঠিত হচ্ছে ভোটের জন্য, অতএব বলা চলে বিএনপি কখনোই জামায়াতের সাথে জোট ছাড়বে না। একারণে নতুন ঐক্য তৈরির শুরুতেই যে শর্তের বেড়াজাল তৈরি হয়েছে তা পূরণ করে নতুন জোট গড়ে উঠে কিনা কিম্বা কতদিন টিকে থাকে সেজন্য অপেক্ষায় থাকবে জনগণ।

সরওয়ার হোসেন
সাংবাদিক

Leave a Reply

Developed by: TechLoge

x