Deprecated: __autoload() is deprecated, use spl_autoload_register() instead in /customers/8/3/c/europerkatha.com/httpd.www/wp-includes/compat.php on line 502 পাকিস্তানের নির্বাচনে সামরিক বাহিনীর প্রভাব এবং বাংলাদেশ – Europerkatha.com

পাকিস্তানের নির্বাচনে সামরিক বাহিনীর প্রভাব এবং বাংলাদেশ

Posted on by

 

ক্রিকেট বিশ্ব জয়ের পর নিজ দেশের জনগণের মন জয় করলেন ক্রিকেটের রবপুত্র ইমরান খান। ১৯৯২ সালে বিশ্বকে হতবাক করেদিয়ে জিতেছিলেন বিশ্বকাপ ক্রিকেটের শিরোপা। এবার ২২ বছরের সাধনার পর তার দল তেহরিক ই ইনসাফ গত ২৫ জুলাই অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্টতা লাভ করে। পরে অন্যান্য ছোট দলগুলোর সমর্থন নিয়ে গত ১৭ আগস্ট মুসলিম লীগ-নওয়াজের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী পদচ্যুত প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের ভাই শাহবাজ শরীফকে হারিয়ে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন ইমরান খান। শপথ নেন শনিবার। এরমধ্য দিয়ে পাকিস্তানের মসনদে বসলেন ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই ক্রিকেটার।

 

ইমরান খান নির্বাচনকালীন সময়ে সেনাবাহিনীর প্রচ্ছন্ন সমর্থন যে পেয়েছেন তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। নির্বাচনকালীন সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম এবং দেশী বিদেশী সংস্থার পর্যবেক্ষণে এটি ফুটে উঠেছে। পাকিস্তানের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচনে বিপুল সংখ্যক সেনা মোতায়েন করা হয়েছে, যার সংখ্যা তিন লাখ ৭০ হাজার। নির্বাচনে সুস্থ এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্যই সেনা মোতায়েন করা হয়েছে বলে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে অভিযোগ উঠেছে অনেকগুলো নির্বাচনী কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে নিরাপত্তা বাহিনী, গণমাধ্যম কর্মীদের ভোটকেন্দ্রে যেতে দেয়নি তারা। ইউরোপিয় ইউনিয়নের পর্যবেক্ষক দল বলছে, ভোট গণনার সময় নিরাপত্তা কর্মীরা ফলাফল রেকর্ড করা এবং ফলাফল প্রেরণের সময় টেবুলেশন তৈরিতে তারা হস্তক্ষেপ করেছে। এমনকি ইসলামাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি শওকত আজিজ সিদ্দিক অভিযোগ করেছেন, রাজনীতিতে ‘দু’দিনের অতিথি’ ইমরান খানকে জেতাতে তলে তলে সব প্রস্তুতিও সেরে ফেলেছে খাকি উর্দিধারীরা। তিনি আরো অভিযোগ করেছেন, পাকিস্তানের বিচার ব্যবস্থা এবং গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করছে সেনা গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। নির্বাচনের পূর্বে বিভিন্ন বিদেশী গণমাধ্যমের প্রতিবেদন দেখা গেছে, সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থা নওয়াজ শরীফের মুসলিম লীগের অনেক প্রার্থীকে নানাভাবে নাজেহাল করেছে। ২১ জুলাই নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে পাঞ্জাব প্রদেশে মুসলিম লীগ নওয়াজের এক প্রার্থী রানা ইকবাল সিরাজের সাক্ষাতকার ছাপা হয়। এতে সিরাজ অভিযোগ করেন, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন প্রথমে ফোনে হুমকি দেয় তাকে। পরে তার ব্যবসা প্রতিষ্টানে তল্লাশী চালিয়ে কর্মচারীদের মারধর করে। তিনি অভিযোগ করেন, এর মাধ্যমে তাকে আর্থিকভাবে দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়, যাতে তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন। এছাড়া অনেক প্রার্থী সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই থেকে হুমকি পেয়েছেন বলেও অভিযোগ করেছেন। নির্বাচনের পূর্বে শুধুমাত্র পাঞ্জাবেই কমপক্ষে ২১ জন সাবেক মুসলিম লীগ-নওয়াজ দলের জাতীয় পরিষদ সদস্য দলত্যাগ করে ইমরান খানে দলে যোগ দিয়েছেন। এরা সকলে সামরিক বাহিনীর কাছ থেকে হুমকি পেয়ে দলত্যাগ করেছেন বলে অভিযোগ নওয়াজের দলের। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফকে নির্বাচনের অযোগ্য ঘোষণা এবং কারাদন্ড দেওয়ার সুপ্রীম কোর্টের সিদ্ধান্ত নিয়েও রয়েছে সমালোচনা। নওয়াজের দল ছাড়াও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক বাহিনীর মদদে এমন রায় দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি নাসির সাকিব, যিনি একসময় আইনজীবি হিসেবে নওয়াজ শরীফের হয়ে মামলা পরিচালনা করতেন। পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতিদের অতীত ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় প্রায় সকলে সামরিক সরকারকে বৈধতা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোন বিরোধ করেননি। একমাত্র জেনারেল পারভেজ মুশাররফের শাসনামলে প্রধান বিচারপতি ইফতেখার চৌধুরী সরকারী সিদ্ধান্তের বিরোধীতা করেছিলেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর স্বামী পাকিস্তান পিপলস পার্টির কো-চেয়ারম্যান আসিফ আলি জারদারীর বিরুদ্ধে তিন বছর আগের এক অর্থ আত্মাসাৎ মামলা সমন জারী করা হয় নির্বাচনের দুই সপ্তাহ আগে। একে রাজনৈতিক বলে অভিহিত করেছে দলটি। দলটি আরো অভিযোগ করে, নির্বাচনের পূর্বে সেনাবাহিনীর নাম করে তাদের প্রার্থীদের দলবদল করতে বলা হয়েছে, না হয় দূর্নীতির মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেওয়া হয়েছে।

সেনাবাহিনীর সমর্থন পেলেও রাজনীতিতে অত্যন্ত বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়েছেন ইমরান খান। ১৯৯২ সালে ক্রিকেট বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে শিরোপা জেতানোর পর থেকে দেশে কিছু একটা করার জন্য উদগ্রীব ছিলেন তিনি। দেশের সরকারগুলোর সীমাহীন দূর্নীতি, নিয়মিতভাবে সেনাবাহিনীর ক্ষমতাদখল, মুদ্রাস্ফীতি এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের অভাব তাকে পীড়া দিত। এ অবস্থায় ১৯৯৬ সালে ইমরান খান রাজনীতিতে আসেন, গঠন করেন নতুন রাজনৈতিক দল তেহরিক ই ইনসাফ পিটিআই। এরপর থেকে জাতীয় এবং প্রাদেশিক নির্বাচনে দলটি অংশ নিলেও আশানুরুপ সাফল্য দেখাতে পারেনি। ১৯৯৭ সালের নির্বাচনে অংশ নিলেও কোন আসনে জয়ী হতে পারেনি তার দল। এরপর ২০০২ সালে প্রথম এমপি নির্বাচিত হন ইমরান খান, দলের একমাত্র বিজয়ী হিসেবে জাতীয় পরিষদে যান তিনি। কথা বলার সুযোগ পেয়ে তাকে ভালভাবে কাজে লাগানোর কৌশল অবলম্বন করে ক্যারিশমাটিক ইমরান। জাতীয় পরিষদে তিনি পারভেজ মুশাররফ সরকারের দূর্নীতি, স্বৈরতন্ত্র এবং সেনাবাহিনীর অভিযান নিয়ে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করতেন। এমনকি পাকিস্তানের অভ্যন্তরে তালেবানদের বিরুদ্ধে পরিচালিত মার্কিন অভিযান নিয়ে প্রায় সময় প্রশ্ন তোলেন ইমরান খান। মূলত তখন থেকেই রাজনীতিতে ইমরানের ধীরে ধীরে উত্থান শুরু হয়। পরবর্তীতে ২০০২ সালে নির্বাচনের অংশ না নিলেও ক্ষমতায় আসা আসিফ জারদারীরর পিপলস পার্টির বিরুদ্ধে জনমত গঠন করতে শুরু করেন ইমরান খান। বিশেষ করে জারদারীর শাসনামলে দেশের অর্থনীতির বিপর্যস্থ অবস্থা ইমরান খানকে সুযোগ করে দেয়। এসময় তিনি সারাদেশে সরকারের দূর্নীতির বিরুদ্ধে প্রচারাভিযান চালান। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করে তরুণদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেন, যাতে অনেকটা সফলতা আসে। তবে জনপ্রিয়তা এবং ভোট বাড়াতে ইমরান খান উপমহাদেশের রাজনীতির পুরানো অস্ত্র ধর্মকেও ব্যবহার করেছেন। ব্লাসফেমী আইনের পক্ষে ওকালতি করতে দেখা যায় তাকে। এমনকি নারীদের যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে আনা একটি বিলের বিপক্ষেও ভোট দেন ইমরান খান।

রাজনীতিতে আসার পর ব্যক্তিজীবনেও বিপর্যয় দেখা দেয় ইমরানের জীবনে। ১৯৯৫ সালে যুক্তরাজ্যের ধনকুবের গোল্ডস্মীথের মেয়ে জেমিমা গোল্ডস্মীথকে বিয়ে করে সুখে থাকলেও ২০০৫ সালে তাদের বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর ২০১৫ সালে বিয়ে করেন পাকিস্তানী বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক সাংবাদিক রেহাম খানকে। যদি ১০ মাসের মধ্যে ভেঙ্গে যায় তাদের সস্পর্ক। সর্বশেষ এবছর বিয়ে করেন বুশরা মানেকা নামের এক মহিলাকে যিনি এলাকায় আধ্যাত্মিক গুরু বা পীর হিসেবে পরিচিতি। যদিও এ বিয়েকে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের কৌশল বলে অভিধা দিয়েছেন অনেকে।

যাহোক না কেন, ক্ষমতায় আসার পর ইমরার খান এখন সেনাবাহিনীর সাথে কি রকম সম্পর্ক রাখেন সেটাই দেখার বিষয়। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী মূলত এমন এক সরকার চেয়েছে যাতে কোন দল একক সংখ্যাগরিষ্টতা না পায়। সেক্ষেত্রে তারা সফল। বর্তমান কোয়ালিশন সরকার একক সিদ্ধান্তে কিছু করতে পারবেনা। সেনাবাহিনী তাদের কতৃর্ত্ব বজায় রাখতে চাইবে, বিশেষ করে তাদের বাজেট যাতে না কমে এবং বৈদেশিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত নীতিনির্ধারণে যাতে তাদের খবরদারীত্ব বহাল থাকে। এ বছরের শুরুর দিকে ট্রাম্প প্রশাসন সন্ত্রাসীদলের সাথে আঁতাতের অভিযোগে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর জন্য ১ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ বাতিল করে। এরপর থেকে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী চীনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করেছে। এছাড়া চিরশত্রু ভারতে সাথে সম্পর্ক, তালেবানদের সহায়তা করা বিষয়ে নওয়াজ সরকারের সাথে সেনাবাহিনীর বিরোধ ছিল চরমে। এসব বিষয় নিয়ে ইমরান খানকে গভীর চিন্তাভাবনা করে পদক্ষেপ নিতে হবে।

বাংলাদেশেও আমরা সেনাবাহিনীর সরাসরি ক্ষমতা দখল বা সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত সরকারের শাসন দেখেছি। পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা দখল ছিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রথম কলংক। জেনারেল জিয়া অত্যন্ত সুকৌশলে রাজনৈতিক সরকারের কাঁধে ভর করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিলেন। পরে হ্যাঁ/না ভোট দিয়ে এবং রাজনৈতিক দল গঠন করে ক্ষমতাকে জায়েজ করার চেষ্টা করেছিলেন। পরবর্তীতে জেনারেল এরশাদ সরাসরি ক্ষমতা দখল করে সেনাবাহিনীকে ষোলআনায় কলংকিত করেন। এরপর বিশ্ব রাজনীতির বিবর্তনের ফলে সেনাবাহিনী সরাসরি ক্ষমতা দখল না করলেও আমরা এক এগারতে নতুন ধরনের সরকার দেখেছি। সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ মদদে ক্ষমতায় আসে ফখরুদ্দিন সরকার। যদিও সে সময়ে এধরনের একটি ধাক্কা রাজনীতিবিদদের জন্য প্রয়োজন ছিল বলে অনেকে মনে করেন। তাদের দূর্নীতিবিরোধী অভিযান সাধারণ জনগনের নীরব সমর্থনও পেয়েছিল। কিন্তু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অনির্বাচিত সরকার কখনো সমাধান হতে পারেনা। তাই শেষ পর্যন্ত সুবিধা করতে পারেনি ফখরুদ্দিন সরকার।

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থায় সেনাবাহিনী কোন হস্তক্ষেপ করবে কিনা তা প্রশ্নসাপেক্ষ। তবে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে সে সম্ভাবনা ক্ষীণ। কিন্তু ভাবনার বিষয় হচ্ছে পাশ্ববর্তী পাকিস্তানের মতো বা এক এগার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে যদি সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করে পুতুল সরকার বানানোর চেষ্টা করে তাহলে রাজনৈতিক দলগুলো সেটি প্রতিহত করতে পারবে কিনা। অতীতের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় বন্দুকের নলের মাথায় রাজনীতিবিদগণ বারবারই নতি স্বীকার করেছে। আবার প্রতিটি সামরিক সরকারই পরবর্তীতে রাজনৈতিক দল গঠন করে ঠিকই রাজনীতির ছায়াতলে এসে নিজেদের ক্ষমতাকে নিরাপদ করার চেষ্টা করেছে।

লেখক : সর‌ওয়ার হোসেন, সাংবাদিক

Leave a Reply

Developed by: TechLoge

x