Deprecated: __autoload() is deprecated, use spl_autoload_register() instead in /customers/8/3/c/europerkatha.com/httpd.www/wp-includes/compat.php on line 502 ইতিহাস বিকৃতির অপরাজনীতি – Europerkatha.com

ইতিহাস বিকৃতির অপরাজনীতি

Posted on by

রোকেয়া প্রাচী

১৯৭৫-পরবর্তী সময়ে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে প্রথম ছিনতাই আর পাল্টে ফেলার সংস্কৃতি তৈরি হয়। সেটাকে আমরা রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি বলতে পারি। এই সময়ে মানুষের মেধা ও মননকে নষ্ট করার প্রথম একটি অপরাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয় বাংলাদেশে।

ছিনতাই হয়ে যায় জয় বাংলা। জয় বাংলাকে শেষ করে নির্বাসনে দেওয়া হয়। আমরা কী পেলাম? পাকিস্তান জিন্দাবাদের আদলে বাংলাদেশ জিন্দাবাদ। একেই ইতিহাসের সন্ত্রাস, অপরাজনীতি আর অপশক্তির উত্থান বলে আখ্যায়িত করা যায়। ১৯৭৫-পরবর্তী সময়ে অবাক হয়ে দেখলাম, যারা বাংলাদেশের বিপক্ষে, যারা ১৯৭১ সালে প্রকাশ্যে স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে, বাংলাদেশের ৩০ লাখ শহীদের দায়ভার যাদের ওপর, যারা বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে, যারা মা-বোনদের সল্ফ্ভ্রমহানির জন্য দায়ী, তারাই বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পেয়ে যায়।

গোলাম আযমের মতো একজন কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী নাগরিকত্ব পায় এবং তার মতো ব্যক্তিরাই ক্ষমতার শীর্ষে থেকে ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করে; বাংলাদেশের জনসম্পদ লুটতরাজ করে। রাষ্ট্রকে সাম্প্র্রদায়িকভাবে উগ্র করে তোলে। এসব দেখেই একটা প্রজন্ম বেড়ে ওঠে বিভ্রান্তি ও ভুল ইতিহাসের মধ্য দিয়ে। স্বাধীনতার পর থেকে ২৪ বছর প্রশাসন ও রাজনীতিতে আমরা এ দুর্বৃত্তায়ন দেখেছি। আজকের বাংলাদেশে আমরা সিস্টেমের যেসব অপব্যবহার দেখি, দুর্নীতির ক্ষেত্রগুলো দেখি, যা কিছু সংস্কার করতে হচ্ছে, যেসব আবর্জনা আমাদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেগুলোর সৃষ্টি কিন্তু ‘৭৫-পরবর্তী সময়েই।

এই অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর ছাড়াই একটা প্রজন্ম মিথ্যা তথ্যের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। তাদের আসলে মিথ্যা থেকে বের করে আনাও খুব কঠিন। অনেক রাজনৈতিক দূষণের ভেতর দিয়ে যে মিথ্যার বীজ রোপিত হয়েছে, সেই চারাগাছ আজ বিষবৃক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেটাকে সমূলে উপড়ে ফেলা দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর মধ্য দিয়েই তৈরি হয় আন্দোলন। জনগণের আন্দোলন, জনসম্পৃক্ততার আন্দোলন। যেটা ছিল অস্তিত্বের সংকট- যুদ্ধাপরাধীর বিচার। যে বিচার বাস্তবায়নের পরিকল্পনা ছিল বঙ্গবন্ধুর। তার নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির মাঠে নামা, সেই মঞ্চে শেখ হাসিনার উপস্থিতি ও নেতৃত্বই বেগবান করে আন্দোলনকে। দাবি একটাই- যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। বিচারের দাবিতে সেই গণজোয়ারকে জনগণের সমর্থনে এগিয়ে নিয়ে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

ক্ষমতায় আসার পরও তিনি জনগণের এ দাবিটি নিয়েই কাজ করেছেন।

নানা দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে বিচার প্রক্রিয়া যখন শুরু হলো, তখন একটি রায়কে কেন্দ্র করে পুনরায় জনগণ যুদ্ধাপরাধের যথাযথ বিচার দাবিতে পথে নেমে এলো। তৈরি হলো গণজাগরণ মঞ্চ। যুদ্ধাপরাধের এ বিচার শেখ হাসিনার নির্বাচনী ম্যান্ডেটও ছিল।

কেননা, এ দাবিটি শেখ হাসিনার একার দাবি ছিল না; শুধুই আওয়ামী লীগেরও না। এটি পুরো বাংলাদেশের দাবি, বাংলাভাষী মানুষের দাবি, মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের দাবি। এ দাবিকে শেখ হাসিনা সমর্থন করেছেন, আওয়ামী লীগ সমর্থন করেছে। এক রকম জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শেখ হাসিনা সেটি কার্যকর করেছেন। এ দাবি পূরণে বাধা দিতে বিএনপি-জামায়াতের ছিল পেট্রোল বোমার আগুন সন্ত্রাসের জ্বালাও পোড়াও তাণ্ডব। তবু আপসহীন শেখ হাসিনা থেকেছেন জনগণের দাবির পক্ষে।

এ দাবি পূরণ করার আগেই আমরা দেখেছি হেফাজতে ইসলামের উত্থান হয়েছে; তারা ১৩ দফা দাবি নিয়ে মাঠে নামে। সেই ১৩ দফা কর্মসূচি সমর্থন করল বিএনপি-জামায়াত। সেই ১৩ দফা দাবিটি প্রকৃত অর্থে গিয়ে পরিণত হলো সরকার পতনের দাবিতে। সেই দাবি শেখ হাসিনা যদি তখন প্রতিহত করতে না পারতেন, তাহলে আজকে আমরা মেয়েরা টক শোতে যাচ্ছি, রাস্তায় নির্বিঘ্নে চলাফেরা করছি, পড়াশোনা করছি-চাকরি করছি, আন্দোলন করছি; তা আর হতো না। এই ১৩ দফা ছিল নারীবিদ্বেষী, বাংলা সংস্কৃতিবিরোধী, উন্নয়নবিরোধী। বাংলাদেশের কোনো সচেতন নাগরিক এসব সমর্থন করতে পারে না। অথচ খালেদা জিয়া একজন নারী হয়ে, সাবেক নারী প্রধানমন্ত্রী হয়েও এ নারীবিদ্বেষী, রাষ্ট্রবিরোধী দাবিকে সমর্থন করেছিলেন। এ দাবির কর্মসূচি গিয়ে দাঁড়িয়েছিল ঢাকা ঘেরাও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে। যার মূল লক্ষ্য সরকার পতন।

তার পর আমরা দেখি আরেকটি আন্দোলন; কোটা সংস্কার আন্দোলন। কিছু যৌক্তিকতা ও জনসমর্থন থাকলেও সে আন্দোলনও গিয়ে দাঁড়াল মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপক্ষে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বিপক্ষে, সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে বিব্রত করার আন্দোলনে। এ আন্দোলনকেও সমর্থন করল বিএনপি-জামায়াত। তাদের কাছে জিম্মি হয়ে যাওয়ার কারণে এ আন্দোলন তার যৌক্তিকতা হারাল। তারেক রহমানের সম্পৃক্ততার কারণে তরুণ প্রজন্মের এই আন্দোলনের প্রতিও সাধারণ মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলল।

এর পর আমরা দেখতে পাই আমাদের ছোট ছোট কোমলমতি বাচ্চার দ্বারা সংগঠিত নিরাপদ সড়কের আন্দোলন। যে দাবির প্রতি বাংলাদেশের সব মানুষের সহানুভূতি ও সমর্থন ছিল। আন্দোলনের প্রথমদিকের আচরণে আমরা আশান্বিত ও অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। আজকের বাংলাদেশের যে প্রজন্মকে আমরা ফেসবুকে ডুবে থাকা, রাজনীতিবিমুখ, নির্বিকার ভেবেছিলাম; সেই প্রজন্মই রাজপথে নেমে এলো সিস্টেমের অনিয়মকে সুশৃঙ্খল করতে। প্রখর চিন্তাশীল এই ফুলকুঁড়িদের দেখে জাতি মুগ্ধ হলো। সরকার ও জনগণের সমর্থনে শিশুদের আন্দোলন জাগরিত হলো। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শিশুদের কথায় সব দাবির প্রতি সমর্থন দিয়ে আইন পাস করার প্রক্রিয়া শুরু এবং সম্পন্ন করলেন। শিশুদের হাত ধরে সড়কের সিস্টেম সুগঠনে কঠোর প্রক্রিয়া শুরু করে দিলেন। তবুও গুজবের নৃশংসতা, নির্মম পরিহাস, নিজের জমিনে লজ্জার বেইমানি হিংস্রতার ষড়যন্ত্রের শিকার হলো বাংলাদেশ এই শোকের মাসে। ষড়যন্ত্রকারীরা বিশ্বের সামনে বাংলাদেশের জন্য রচনা করেছিল আরেক কালো অধ্যায়। যার বলি হতে যাচ্ছিল প্রাণের কোমল শিশুরা। চরম আস্টম্ফালনের গুজবে আক্রান্ত হয়েও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ- আমার শিশুদের ওপর ফুলের টোকাও যেন দেওয়া না হয়।

এ আন্দোলনও ছিনতাই হয়ে গেল বিএনপি-জামায়াতের কাছে। পরিণত হলো সরকার উৎখাতের আন্দোলনে।

এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাস অনুযায়ী বিএনপি-জামায়াত প্রতিটি জনসম্পৃক্ত আন্দোলনে যুক্ত হয়ে সেগুলো নষ্ট করেছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে তাদের কোনো সমর্থন নেই; মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় তাদের কোনো সমর্থন নেই; ইতিহাসের পক্ষেও তারা নেই- এটা প্রমাণিত। তারা জনসম্পৃক্ত আন্দোলনে সওয়ার হয়ে সেগুলো সরকার পতনের আন্দোলনে রূপান্তর করার চক্রান্ত করেছে। এটাই তার প্রমাণ।

জনগণের একত্রিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাদের মতামত দেওয়ার যে প্ল্যাটফর্মগুলো তৈরি হতে থাকে, সেগুলো নষ্ট করে দেয় বিএনপি-জামায়াত। একেকটা আন্দোলনকে ছিনতাই করার মাধ্যমে জনগণকে ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করে আসছে তারা। জনগণ যখন নিজেদের কথা বলে, তখন জনগণের দাবিকে কুক্ষিগত করার মধ্য দিয়ে নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করতে চায়। সব অনাচারের দায়ভার জনগণের ওপর চাপাতে চায়।

যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধাপরাধী দল হিসেবে জনগণকে হুমকির মুখে নিয়ে

গেছে। রাষ্ট্রকে অকার্যকর করেছে, বিশ্বের মানচিত্রে জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িক এবং অনুন্নত দেশ হিসেবে পরিচিত করাতে সচেষ্ট থেকেছে। দেশের ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে বিএনপি-জামায়াত জোট জনগণের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে বারবার।

আজ পর্যন্ত জনগণের জন্য কোনো আন্দোলনকে নিজ উদ্যোগে বেগবান করতে পারেনি বিএনপি-জামায়াত। আজকের তরুণদের এ ছিনতাইয়ের ইতিহাস মাথায় নিয়েই এগোতে হবে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের পথে।

লেখক : অভিনেত্রী

Leave a Reply

Developed by: TechLoge

x