Deprecated: __autoload() is deprecated, use spl_autoload_register() instead in /customers/8/3/c/europerkatha.com/httpd.www/wp-includes/compat.php on line 502 নিরাপদ সড়কের জন্য সচেতনতা জরুরী – Europerkatha.com

নিরাপদ সড়কের জন্য সচেতনতা জরুরী

Posted on by

 

নিরাপদ সড়কের দাবীতে উত্তাল পুরো বাংলাদেশ। স্কুলের ছোট ছোট শিশুরা নেমেছে রাস্তায়। গত ২৯ জুলাই দুপুরে রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের অদূরে বিমানবন্দর সড়কে (র‌্যাডিসন হোটেলের উল্টোদিকে) বাসচাপায় রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী দিয়া খানম মীম ও আব্দুল করিম নিহত হয়। ওইদিন দুপুর সাড়ে ১২টায় বিমানবন্দর সড়কের বাঁ-পাশে বাসের জন্য অপেক্ষা করার সময় জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাস তাদের চাপা দিলে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এ সময় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়। এরপর থেকে শুরু হয় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা ৯টি দাবী তুলে ধরে। দাবিগুলো হচ্ছে,
১. বেপরোয়া চালককে ফাঁসি দিতে হবে এবং এই শাস্তি সংবিধানে সংযোজন করতে হবে
২. নৌপরিবহনমন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাহার করে শিক্ষার্থীদের কাছে তাকে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে
৩. শিক্ষার্থীদের চলাচলে এমইএসে ফুটওভার ব্রিজ বা বিকল্প নিরাপদ ব্যবস্থা নিতে হবে
৪. প্রত্যেক সড়কের দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় স্পিড ব্রেকার দিতে হবে
৫. সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ছাত্র-ছাত্রীদের দায়ভার সরকারকে নিতে হবে
৬. শিক্ষার্থীরা বাস থামানোর সিগন্যাল দিলে থামিয়ে তাদের বাসে তুলতে হবে
৭. শুধু ঢাকা নয়, সারাদেশে শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়ার ব্যবস্থা করতে হবে
৮. রাস্তায় ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল এবং লাইসেন্স ছাড়া চালকদের গাড়ি চালনা বন্ধ করতে হবে এবং
৯. বাসে অতিরিক্ত যাত্রী নেওয়া যাবে না।

এসব দাবীর সাথে সরকারও সহমত পোষণ করেছে এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইতিমধ্যে এসব দাবী বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহনের কথা জানিয়েছেন।
কিন্তু আমাদের দেখতে হবে এসব অনিয়ম কখন কিভাবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অনুপ্রবেশ করেছে। স্বাধীনতার যুদ্ধ বিধ্বস্থ বাংলাদেশকে গড়ার জন্য যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দিনরাত পরিশ্রম করছেন তখনও স্বাধীনতা বিরোধীরা এদেশে তাদের দোসরদের দিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করেছে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর শুরু হয়েছে নতুন খেলা। নব্য সাম্রাজ্যবাদীরা নিজেদের ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার জন্য সৃষ্টি করেছে বিভিন্ন দল উপদল। নিজেদের মতো করে সাজিয়েছে প্রশাসন, সেনাবাহিনীসহ সমাজ এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। আমলা, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সাংবাদিকসহ পেশাজীবি এমনকি শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি করেছে নিজেদের চাটুকার শ্রেণী। এদের আশ্রয় প্রশ্রয় দিতে দিতে অবস্থা এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে, আমাদের এলাকার একটা প্রবাদ মনে পড়ছে- ডেকছি থেকে ঢাকনা গরম- অর্থাৎ দল এখন এসব সুবিধাভোগী চাটুকারদের কথায় চলতে হয়। একারণের আজ বিভিন্ন সেক্টরে অনিয়ম আর দূর্নীতি বাসা বেধেছে।
বর্তমান সরকার দুই মেয়াদে ক্ষমতায়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে দেশের একটি বিশেষ গোষ্ঠীতো বটেই, বিশ্বের শক্তিশালী কয়েকটি দেশেরও রোষানলে পড়েছে আওয়ামীলীগ সরকার। অঢেল অর্থ খরচ করা হচ্ছে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য। সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষূন্ন করার জন্য রাজনৈতিক, কূটনৈতিক এমনকি সন্ত্রাসের পথও বেছে নিয়েছে একটি বিশেষ গোষ্ঠী। আন্তর্জাতিক লবিস্ট নিয়োগ করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় চালানো হয়েছে অনেক প্রপাগান্ডা। তবে সরকার প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে শুধু বিরোধী দলের চাপ সহ্য করছেন তা নয়, নিজ দলের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা মোশতাকের প্রেতাত্মদেরও সামলাতে হচ্ছে। দলীয় নেতা এবং মন্ত্রীদের নানা সময়ে বেফাস মন্তব্যের জেরে সমালোচনার তীর ছুটে যায় প্রধানমন্ত্রীর দিকে। তারপরও শক্ত হাতে সামাল দিয়ে চলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এবার আসি আন্দোলন প্রসঙ্গে। নিরাপদ সড়কের দাবীতে চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন আন্দোলন করছেন দুই দশক ধরে। সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকে তিনি এ আন্দোলন শুরু করেন। সভা, সমাবেশ, মানববন্ধন করেছেন। জেলা এবং থানা পর্যায়ে রয়েছে কমিটি, এমনকি বিভিন্ন দেশেও তিনি চষে বেড়িয়েছেন জনমত সংগ্রহের জন্য। তিনি দূর্ঘটনা কমাতে কঠোর আইন করার পাশাপাশি সচেতনতার উপর জোর দিয়েছেন। তাঁর এ আন্দোলন কখনো সহিংসতা ছড়ায়নি। একেবারে দুএকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বাদে এবারের আন্দোলনও চলছে শান্তিপূর্ণভাবে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিসসহ জরুরী পরিবহনের জন্য বিশেষ লেন করা হয়েছে। এক লেনে চলেছে রিকশা। অন্যান্য গাড়ীগুলোও লেন মেনে গাড়ী চালিয়েছে। ইতিবাচক এসব দিকের পাশাপাশি সবচেয়ে উদ্বেগজনক যে বিষয় ধরা পড়েছে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে তা হচ্ছে লাইসেন্স বিহীন গাড়ীর অবাধ চলাচল। আশ্চর্যের বিষয় হলো লাইসেন্স বিহীন গাড়ীর মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গাড়ী, বিচারপতির গাড়ী, মন্ত্রী, এমপি, সাংসদের গাড়ী, র‌্যাব পুলিশের গাড়ী, এমনকি বাদ যায়নি সাংবাদিকের গাড়ীও। এসব গাড়ীর মধ্যে কেউ কেউ আবার লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও উল্টো দাপট দেখানোর চেষ্টা করেছেন। ফলাফল কান ধরে উঠাবসা করানো এবং গাড়ীতে কর্মফলের চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে শিক্ষার্থীরা।
তবে আন্দোলনের সফলতা যেন সহিংসতায় হারিয়ে না যায় সেদিকে তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখতে হবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একে সফলতা ছিনতাই করার প্রবণতা পুরানো। সম্প্রতিককালে সেটা তীব্রভাবে প্রকট হচ্ছে। যেকোন গনদাবীকে শেষ পর্যন্ত সরকার পতনের আন্দোলনে রুপ দেওয়ার চেষ্টা করছে কয়েকটি রাজনৈতিক দল। একটি বিশেষ গোষ্ঠী যেকোন আন্দোলন সংগ্রামে সহিংসতা উস্কে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তাদের প্রধান লক্ষ্য যেকোন কিছুর বিনিময়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা।
বাংলাদেশে ছাত্রদের আন্দোল সংগ্রামের বর্ণাঢ্য এবং গর্ব করার মতো ইতিহাস রয়েছে। ৫২‘র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৬৯’র গণ অভ্যূত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ৯০‘র সর্বশেষ স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে ছাত্রসমাজের অনন্যসাধারণ ভূমিকা সকলেই প্রতক্ষ্য করেছে। গণজাগরণ মঞ্চের সাথে সর্বস্তরের তরুণদের সম্পৃক্ততাও নতুন করে আশার আলো জাগিয়েছে জনগণের মনে। তাই এবারের ছাত্র আন্দোলনও জনগনের আকুন্ঠ সমর্থন লাভ করেছে। সরকারও শিক্ষার্থীদের দাবীর প্রতি দিয়েছে সমর্থন। এবার বাস্তবায়নের পালা। সেজন্য সরকারকে অবশ্যই সময় দিতে হবে। দীর্ঘদিনের অনিয়ম দূর করা একদিন বা মাসে সম্ভব নয়। দেশ ও সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করা দূর্নীতির মূলোৎপটন ঘটাতে হলে বিপ্লব সাধন করতে হবে। তবে যেহেতু ছাত্রসমাজের জোরালো সমর্থন রয়েছে, এক্ষেত্রে সরকারের জন্য কাজটি অনেক সহজ হয়ে যাবে। নিরাপদ সড়কের জন্য অনেকগুলো পদক্ষেপ নিতে হবে। সারাদেশের ভাঙ্গাচোড়া সড়ক মেরামত করে নিরাপদ চলাচলের উপযোগী করতে হবে। বিশেষ করে মহাসড়কগুলোকে নিরাপদ করতে হবে। বর্ষাকালে অব্যহত ভাঙ্গনের কবল থেকে রক্ষা করতে হবে রাস্তাগুলোকে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে রাস্তায় স্পিডব্রেকার নির্মাণ করতে হবে। পথচারীদের চলাচলের জন্য ফ্লাইওভার ব্রীজ নির্মাণের পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের আদলে ইয়েলো সাইনযুক্ত পথচারী চলাচলের পথ তৈরি করা যেতে পারে। শহরের মধ্যকার রাস্তাগুলোতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের জন্য ক্যামেরা বসানো যেতে পারে। এতে করে গাড়ীর গতি নিয়ন্ত্রণ, উল্টাপথে চলা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। আইন ভঙ্গ করলে জরিমানা, লাইসেন্সে পয়েন্ট দেওয়া এবং জেলের বিধান রাখতে হবে।
সড়ক নিরাপদ করার পাশাপাশি দেখতে হবে এসব সড়কে চলাচল করা গাড়ীগুলো নিরাপদ কিনা। ফিটনেসবিহীন গাড়ী কোনমতেই যাতে রাস্তায় চলাচল করতে না পারে সেজন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষকে কঠোর নজরদারী চালাতে হবে। ফিটনেস সার্টিফিকেট নেওয়ার বিধান থাকলেও সেটা কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ। এ অবস্থার পরিবর্তন করতে হবে। এক্ষেত্রে গাড়ী মালিকদের জরিমানাসহ অন্যান্য শাস্তির আওতায় আনা যেতে পারে। রাস্তায় নির্দিষ্ট লেন তৈরি করতে হবে গাড়ী চালানোর জন্য। এম্বুলেন্সসহ জরুরী কাজে নিয়োজিত গাড়ীর জন্য বিশেষ লেন করা যেতে পারে। রিকশার জন্য তৈরি করা যায় নির্দিষ্ট লেন। সবচেয়ে যেটা জরুরী সেটা হলো সঠিকভাবে যাচাই এবং পরীক্ষার মাধ্যমে চালকদের লাইসেন্স দেওয়া। এক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোরতার সাথে নিয়মকানুন মেনে লাইসেন্স দিতে হবে। বর্তমানে অনিয়মের মাধ্যমে অবাধে লাইসেন্স দেওয়া হয়, এমনকি অপ্রাপ্তবয়স্কদেরও লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে। এটা সমূলে বন্ধ করতে হবে।
এ আন্দোলনের ফলে ঢাকার রাস্তাগুলোর চিরাচরিত যানজট দূর হয়ে গেছে। প্রমাণিত হয়েছে আইন মেনে চললে যানজট যেমন কমে তেমনি দূর্ঘটনা কমারও সম্ভবানা বেড়ে যায়। এখন শুধু শিশুদের দেখানো পথে চলার লড়াই। লেন মেনে গাড়ী চালানো, লাইসেন্স নিয়ে গাড়ী চলানো, ওভারটেক করে যাত্রী তোলার প্রতিযোগীতা না করা, এম্বুলেন্স, ফায়ারব্রিগেডসহ জরুরীকাজে নিয়োজিত গাড়ীর জন্য আলাদা লেনের ব্যবস্থা করাসহ শিক্ষার্থীরা যেসব আইন কাগজ থেকে বের করে বাস্তবায়িত করেছে তাদের সচল রাখতে হবে। ভিআইপিদের উল্টোপথে গাড়ী চালানো বন্ধ করতে হবে। তবে সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে। ফুটপাত ধরে হাঁটা, ফ্লাইওভার ব্রীজ ব্যবহার করা, যত্রতত্র রাস্তা পারাপার না হওয়ার বিষয়ে পথচারীদের সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। সকলে সতর্ক এবং সচেতন হলেই সড়ক নিরাপদ করা সম্ভব হবে।

সরওয়ার হোসেন

প্রধান সম্পাদক, নিউজলাইফ২৪.কম
প্রধান বার্তা সম্পাদক, চ্যানেল আই ইউরোপ

Leave a Reply

More News from কলাম

More News

Developed by: TechLoge

x